
ডেক্স রিপোর্ট
বাংলাদেশ রাইফেলস (বিডিআর) বিদ্রোহ ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি সংঘটিত একটি অভ্যুত্থানমূলক ঘটনা, যেখানে বিডিআরের বিদ্রোহী সদস্যরা তাদের সিনিয়র অফিসারদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করে এবং ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালায়। এই ঘটনাটি বাংলাদেশের সামরিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসে নির্মম মর্মান্তিক ও বিতর্কিত অধ্যায়।
বিডিআর ছিল বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি আধা-সামরিক বাহিনী, যার প্রধান দায়িত্ব ছিল সীমান্ত রক্ষা। দীর্ঘদিন ধরে বিডিআরের সদস্যরা সেনাবাহিনীর মধ্যে সুসম্পর্ক রক্ষার মধ্যে দিয়ে পরিচালিত হতো।২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি, ঢাকার পিলখানায় অবস্থিত বিডিআরের সদর দফতরে বার্ষিক ‘দারবার’ (সভা) চলাকালীন হঠাৎ বিদ্রোহ শুরু হয়। বিদ্রোহীরা সশস্ত্র অবস্থায় সেনা কর্মকর্তাদের উপর হামলা চালায় এবং প্রধান ফটক বন্ধ করে দেয়, যাতে বাহ্যিক সাহায্য না আসতে পারে।২৫ ফেব্রুয়ারি ২০০৯ সকাল ৯টার দিকে পিলখানায় বিডিআরের বার্ষিক দারবার শুরু হয়।
হঠাৎ করে বিদ্রোহীরা সশস্ত্র হয়ে মঞ্চ দখল করে এবং উপস্থিত সেনা কর্মকর্তাদের উপর গুলি চালায়।
বিদ্রোহীরা বিডিআর প্রধান মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদসহ অনেক সেনা কর্মকর্তাকে হত্যা করে।
তারা পিলখানার ভেতরে অবস্থান নিয়ে সেনাবাহিনীর পাল্টা অভিযানের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে।বিদ্রোহীরা পরিবারের সদস্যদের জিম্মি করে এবং বিভিন্ন ভবনে অগ্নিসংযোগ করে।২৬ ফেব্রুয়ারি ২০০৯ সরকারের পক্ষ থেকে বিদ্রোহীদের সঙ্গে আলোচনার চেষ্টা করা হয়।তৎকালিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিদ্রোহীদের আত্মসমর্পণ করার আহ্বান জানিয়ে সাধারণ ক্ষমার ঘোষণা দেন।যার ফলে সুনির্দিষ্ট হত্যাকারীরা পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।বিকেলের মধ্যে অন্যান্য বিদ্রোহীরা ধীরে ধীরে আত্মসমর্পণ করতে শুরু করে।সন্ধ্যার মধ্যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে এবং সেনাবাহিনী পুরো এলাকা দখল করে।এই পরিকল্পিত বিদ্রোহে ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তা সহ মোট ৭৪ জন নিহত হন।নিহতদের মধ্যে সেনা কর্মকর্তাদের পরিবার, বিডিআরের নিরীহ সদস্য এবং সাধারণ মানুষও ছিলেন।
বিদ্রোহের পর পিলখানার বিভিন্ন স্থান থেকে গণকবর আবিষ্কৃত হয়।
বিদ্রোহের ফলে বাংলাদেশ রাইফেলস (বিডিআর) বাহিনী বিলুপ্ত করা হয় এবং পরে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) নামে নতুন বাহিনী গঠিত হয়েছিলো।
বিদ্রোহের দায়ে কয়েক হাজার বিডিআর সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়।২০১৩ সালে আদালত এই বিদ্রোহের বিচারে ১৫২ জনকে মৃত্যুদণ্ড, ১৬১ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং শতাধিক ব্যক্তিকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা প্রদান করে।এই বিচার বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম বিচার কার্যক্রম হিসেবে বিবেচিত হলেও বিচারের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।
বিদ্রোহের ফলে সেনাবাহিনী ও আধাসামরিক বাহিনীর মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়েন দেখা দেয়।তৎকালিন সরকারের দুর্বলতার কারণে এ বিদ্রোহের সুষ্ঠ বিচার কাজ সম্পন্ন হয়নি।পরবর্তীতে
সীমান্ত সুরক্ষা বাহিনীতে কাঠামোগত পরিবর্তন এনে নতুন আইন প্রণয়ন করা হয় এবং কোমর ভাঙা মেরুদণ্ড হীন একটি বাহিনী গঠন করা হয় যারা দীর্ঘ ১৫বছরে সীমান্তে ন্যূনতম যোগ্যতার পরিচয়ও দিতে পারে নি।২০০৯ সালের বিডিআর বিদ্রোহ ছিল বাংলাদেশের সামরিক ইতিহাসের অন্যতম অন্ধকার অধ্যায়। বিদ্রোহের নৃশংসতা, বিচার এবং পরবর্তী সংস্কারের মাধ্যমে বাংলাদেশকে একটি শক্তিশালী বার্তা দেয় যে, সামরিক বাহিনী বা আধাসামরিক বাহিনীর মধ্যে ভুল বুঝিয়ে পরিস্থিতি ঘোলাটে করতে পারলে সহজে একটা জাতীকে মেরুদণ্ড হীন করা সম্ভব।