
নিউজ ডেস্ক :
বাংলাদেশকে নিয়ে বিজেপি নেতা ও পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার বিরোধীদলীয় নেতা শুভেন্দু অধিকারীর এক মন্তব্যকে কেন্দ্র করে রাজ্য ও জাতীয় রাজনীতিতে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ইসরায়েল-গাজার যুদ্ধের উদাহরণ টেনে তিনি যে ভাষায় বক্তব্য দিয়েছেন, তা ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে তীব্র সমালোচনা।
শনিবার কলকাতায় বাংলাদেশের ডেপুটি হাইকমিশনের সামনে এক বিক্ষোভ কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে শুভেন্দু অধিকারী বলেন, ইসরায়েল যেভাবে গাজাকে ‘শিক্ষা’ দিয়েছে, বাংলাদেশকেও সেভাবেই শিক্ষা দেওয়া উচিত। বাংলাদেশে দুই হিন্দু নাগরিক দীপু দাস ও অমৃত মণ্ডল হত্যার প্রতিবাদে বিজেপির নেতা-কর্মী ও কয়েকজন হিন্দু ধর্মগুরুকে সঙ্গে নিয়ে ওই মিছিলের আয়োজন করা হয়।
বিক্ষোভ চলাকালে শুভেন্দু আরও বলেন, ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী হিন্দু এবং দেশ পরিচালিত হবে হিন্দুদের স্বার্থে। তিনি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অতীতের সামরিক অভিযানের প্রসঙ্গ টেনে এই বক্তব্য দেন। তার বক্তব্যের ভিডিও এনডিটিভি প্রকাশ করলে তা দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং বিতর্ক আরও তীব্র হয়।
পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতাসীন দল তৃণমূল কংগ্রেস এই মন্তব্যকে ঘৃণামূলক ও উসকানিমূলক বক্তব্য হিসেবে অভিহিত করে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। দলটি এক্সে দেওয়া এক পোস্টে অভিযোগ করে, শুভেন্দু অধিকারী কার্যত গণহত্যার ভাষা ব্যবহার করেছেন, যা সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা উসকে দেওয়ার শামিল।
তৃণমূল কংগ্রেসের নেতারা প্রশ্ন তুলেছেন, এত গুরুতর মন্তব্যের পরও কেন তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা বা আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। দলটির একাধিক নেতা এই বক্তব্যকে “নগ্ন ঘৃণাভাষণ” বলে আখ্যা দেন। রাজ্যসভার উপনেতা সাগরিকা ঘোষ বলেন, বিজেপি নেতৃত্ব ইচ্ছাকৃতভাবে বিভাজনের রাজনীতি উসকে দিচ্ছে, যা বাংলার রাজনৈতিক বাস্তবতায় গ্রহণযোগ্য নয়।
কংগ্রেস নেতা কপিল সিবালও শুভেন্দুর মন্তব্যের সমালোচনা করে বলেন, এমন বক্তব্যের পরও কোনো এফআইআর না হওয়া উদ্বেগজনক এবং এটি আইনের শাসন নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
এদিকে তৃণমূল কংগ্রেস সরাসরি প্রশ্ন তুলেছে—শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্য কি বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অবস্থানকে প্রতিফলিত করে? রাজ্যের মন্ত্রী শশী পাঁজা বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর এই বক্তব্য সমর্থন করেন কি না, তা স্পষ্ট করা উচিত।
বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য অবশ্য দাবি করেন, বিরোধীদলীয় নেতা সাংবিধানিক পদে থেকে জনমতের প্রতিফলন ঘটান এবং তার বক্তব্য দলীয় অবস্থান হিসেবে দেখা উচিত নয়। তবে তৃণমূলের অভিযোগ, রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়েই বিজেপি ইচ্ছাকৃতভাবে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছড়ানোর চেষ্টা করছে।
অন্যদিকে, ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার এখন পর্যন্ত শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্য নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি। প্রধানমন্ত্রী বা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কিছু বলা হয়নি। তবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করার বিষয়ে কূটনৈতিক পর্যায়ে উদ্বেগ জানানো হয়েছে।
বিজেপির এক জ্যেষ্ঠ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, আসন্ন পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন সামনে রেখে শুভেন্দু অধিকারী আগ্রাসী ‘হিন্দু ভোটব্যাংক’ রাজনীতির কৌশল বেছে নিচ্ছেন। গাজা, পাকিস্তান ও বাংলাদেশকে একসঙ্গে তুলে ধরে রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা চলছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
তবে তৃণমূল কংগ্রেসের বক্তব্য পরিষ্কার—পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের রাজনীতি সফল হবে না। শশী পাঁজার ভাষায়, “এই রাজ্যে হিন্দুরা নিরাপদ, সংকটে রয়েছে বিজেপিই।”